আবাসিক মহিলা মাদ্রাসার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন: নিরাপত্তার অভাব নাকি ব্যবস্থার ত্রুটি?
প্রতিবেদক,
ছাদিকুর রহমান সাব্বির
সিলেট বিভাগীয় ব্যরো প্রধান
দুর্নীতি তালাশ নিউজ টিভি
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে নারী শিক্ষার প্রসারে আবাসিক মহিলা মাদ্রাসাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, এসব প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে জনমনে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষ করে ছাত্রীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সচেতন মহল এখন প্রশ্ন তুলছেন— আবাসিক মহিলা মাদ্রাসার কি আদেও প্রয়োজন আছে?
বিশেষজ্ঞ এবং অভিভাবকদের মতে, আবাসিক ব্যবস্থার আড়ালে অনেক ক্ষেত্রে শিশু অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।
নিচে এই দাবির স্বপক্ষে কিছু যৌক্তিক কারণ তুলে ধরা হলো:
১. চরম নিরাপত্তার অভাব ও শিশু নির্যাতন
আবাসিক মাদ্রাসাগুলোর সবচেয়ে অন্ধকার দিক হলো শিশু ও কিশোরীদের নিরাপত্তার অভাব। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আবাসিক মাদ্রাসায় শিশু ধর্ষণ, যৌন হয়রানি এবং শারীরিক নির্যাতনের মতো শিউরে ওঠার মতো ঘটনা সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। বদ্ধ পরিবেশের সুযোগ নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দ্বারা ছাত্রীরা লাঞ্ছিত হচ্ছে, যা শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করছে।
২. পারিবারিক বন্ধন ও মমতা থেকে বিচ্যুতি
একটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য পরিবারের সান্নিধ্য অপরিহার্য। খুব অল্প বয়সে আবাসিক মাদ্রাসায় পাঠিয়ে দেওয়ায় শিশুরা বাবা-মায়ের আদর ও শাসন থেকে বঞ্চিত হয়। এই নিঃসঙ্গতা তাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী বিষণ্ণতা এবং সামাজিক ভীতি তৈরি করতে পারে। পরিবারের নজরদারি না থাকায় অনেক সময় শিশুদের ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো অগোচরেই থেকে যায়।
৩. অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও নিম্নমানের জীবনযাত্রা
দেশের অধিকাংশ আবাসিক মহিলা মাদ্রাসা ছোট এবং ঘিঞ্জি পরিবেশে পরিচালিত হয়। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, স্বাস্থ্যকর খাবার এবং উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থার অভাব এখানে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। গাদাগাদি করে থাকার ফলে খুব সহজেই ছোঁয়াচে রোগ ছড়িয়ে পড়ে, যা ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
৪. দক্ষ তদারকি ও জবাবদিহিতার অভাব
অধিকাংশ বেসরকারি বা কওমি আবাসিক মাদ্রাসা কোনো শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কাঠামোর অধীনে নেই। ফলে সেখানে কী ঘটছে, তার কোনো সঠিক হিসাব বা তদারকি থাকে না। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বা অভিযোগ উঠলে উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে অনেক সময় অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি আবাসিক মাদ্রাসাগুলোকে অনিরাপদ করে তুলছে।
৫. বিকল্প ব্যবস্থার সুযোগ
বর্তমান যুগে নারী শিক্ষার জন্য আবাসিক ব্যবস্থার বাইরেও প্রচুর সুযোগ রয়েছে। অনাবাসিক মাদ্রাসা বা সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেও ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব। নিজ বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করলে শিশুদের নিরাপত্তা যেমন নিশ্চিত হয়, তেমনি অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের প্রতিদিনের কার্যক্রমের ওপর সরাসরি নজর রাখতে পারেন।
বিশেষজ্ঞ অভিমত:
"শিক্ষা হওয়া উচিত আনন্দময় এবং নিরাপদ। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান শিশুর ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই ব্যবস্থার সংস্কার বা বিলুপ্তি সময়ের দাবি। আবাসিক ব্যবস্থার চেয়ে পারিবারিক পরিবেশে থেকে শিক্ষা গ্রহণই শিশুদের জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক।"
উপসংহার:
ধর্মীয় শিক্ষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা যেন কোনোভাবেই কোমলমতি শিশুদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে না ফেলে। আবাসিক মহিলা মাদ্রাসাগুলোতে যদি কঠোর নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব না হয়, তবে শিশুদের ভবিষ্যতের স্বার্থে এই আবাসিক প্রথা বন্ধ করে অনাবাসিক বা পারিবারিক পরিবেশে শিক্ষা নিশ্চিত করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।