লিবিয়ায় চার শতাধিক বাংলাদেশির ওপর নৃশংস নির্যাতনের অভিযোগ — আশরাফ-বাহার ‘মানবপাচার মাফিয়া’ চক্র নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য

বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
লিবিয়ায় অবস্থানরত শত শত বাংলাদেশি তরুণের জীবন আজ চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কে ঘেরা। ভুক্তভোগী পরিবার, প্রবাসী সূত্র ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত চার শতাধিক বাংলাদেশি নাগরিক একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচার চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের নেতৃত্বে রয়েছে কুমিল্লার আশরাফ ও তার ভাই বাহার, যাদের অনেকেই “মানবপাচার মাফিয়া” চক্রের মূল হোতা হিসেবে উল্লেখ করছেন।
সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী দালাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে বাংলাদেশ থেকে তরুণদের বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণা করা হচ্ছে। ইউরোপে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়া হয়। অনেক পরিবার শেষ সম্বল জমি বিক্রি করে কিংবা ঋণ নিয়ে সেই টাকা জোগাড় করে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, বিদেশে পাঠানোর নামে প্রথমে তাদের বিভিন্ন দেশে নেওয়া হয়। পরে অবৈধ পথে লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে তাদের পাসপোর্ট ও কাগজপত্র কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় এক বিভীষিকাময় জীবন।
লিবিয়ায় এসব আটক স্থানের নাম ভুক্তভোগীদের ভাষায় “গেম ঘর”। অভিযোগ রয়েছে, এসব স্থানে দিনের পর দিন মানুষকে অমানবিক পরিবেশে আটকে রাখা হয়। পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হয় না, অসুস্থ হলেও চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকে না। সামান্য প্রতিবাদ করলেই মারধর ও নির্যাতনের শিকার হতে হয় বলে জানিয়েছেন একাধিক ভুক্তভোগী।
সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ হলো—জিম্মি করে রাখা ব্যক্তিদের দিয়ে পরিবারের কাছে ফোন করিয়ে মুক্তিপণের টাকা দাবি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়। নির্ধারিত সময়ে টাকা না পেলে নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দ্রুত টাকা পাঠাতে বাধ্য করার ঘটনাও ঘটছে বলে জানা গেছে।
এই মানবপাচার চক্রের সঙ্গে আশরাফের দুই স্ত্রী—মাদারীপুরের রুনা ও বরিশালের সিমুর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠেছে। বিভিন্ন সূত্র বলছে, তারা বিদেশে অবস্থান করে দালাল নেটওয়ার্ককে সহযোগিতা করেন এবং নতুন প্রবাসপ্রত্যাশীদের প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলতে ভূমিকা রাখেন।
এছাড়া আশরাফের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে আকাশ নামের এক ব্যক্তির নামও সামনে এসেছে। জানা গেছে, আকাশের বাড়ি সিলেট জেলায় এবং তিনি আশরাফের একান্ত সহকারী হিসেবে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, এই চক্রের নির্দেশেই লিবিয়ার বিভিন্ন স্থানে আটক কেন্দ্র পরিচালনা করা হয় এবং সেখান থেকেই পরিবারগুলোর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, কথিত এই “আশরাফ-বাহার মানবপাচার মাফিয়া চক্র” দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক পাচার নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থেকে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, লিবিয়ায় বাংলাদেশিদের ওপর এমন নির্যাতনের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তারা অবিলম্বে ভুক্তভোগীদের উদ্ধার, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানবপাচার চক্রের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও এখন পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *