মোঃ আইনুল ইসলাম
বিভাগীয় সম্পাদক,
দুর্নীতি তালাশ নিউজ টিভি।
পৃথিবীতে মা এমন এক মহামূল্যবান সম্পদ, যার বিকল্প কোনো কিছু হতে পারে না। যে মা দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করে অসীম কষ্ট সহ্য করে সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখান, নিজের সুখ-শান্তি বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে বড় করেন, সেই মায়ের জীবনের শেষ অধ্যায় কি হওয়া উচিত সন্তানের ভালোবাসায় পরিপূর্ণ? নাকি অপেক্ষা, নিঃসঙ্গতা আর চোখের জলে ভেজা দীর্ঘশ্বাস?
দিনাজপুর পৌরসভার একটি মহল্লা থেকে উঠে এসেছে এমনই এক হৃদয়বিদারক মানবিক বাস্তবতা, যা শুধু একটি পরিবারের নয়—সমাজের অসংখ্য মানুষের জন্যও একটি নীরব শিক্ষা। জানা গেছে, ব্রেনস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে এক বয়স্ক বৃদ্ধা মা বর্তমানে জীবনের শেষ অধ্যায় পার করছেন। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতায় ভুগতে থাকা এই মা নিজে চলাফেরা করতে পারেন না, নিজ হাতে খেতে পারেন না, এমনকি নিজের প্রয়োজনীয় কাজগুলোও করতে পারেন না। অধিকাংশ সময় তাকে হুইলচেয়ারে বসে থাকতে হয়
এবং প্রতিটি কাজে অন্যের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, তার পাশে রয়েছেন ছোট ছেলে ও তার স্ত্রী। অসুস্থ মায়ের প্রতিদিনের পরিচর্যা, খাওয়ানো, ওষুধ, কিছু ডায়াপারের ব্যবস্থা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের দায়িত্ব তারাই পালন করছেন।
অন্যদিকে পরিবারের আরও কয়েকজন কোটিপতি হাজী সন্তান এবং সেই হাজীদের ছেলে-মেয়ে থাকলেও অভিযোগ রয়েছে—মায়ের এবং দাদীর দৈনন্দিন খোঁজখবর নেওয়া বা পাশে সময় দেওয়ার ক্ষেত্রে সেই আন্তরিক উপস্থিতি খুব কমই দেখা যায়। এবং কেউ কেউ একেবারেই আসে না, অথচ তারা সবাই একই শহরের কাছাকাছি আলাদা আলাদা বাড়ীতে বসবাস করেন।
স্থানীয়দের মতে, একজন অসুস্থ মায়ের যেখানে প্রতিদিন সন্তানের উপস্থিতি প্রয়োজন, সেখানে অনেক সময় মাসের পর মাসও কিছু সন্তানের খোঁজখবর খুব কম পাওয়া যায়। এমনও সময় গেছে—ঈদের মতো আনন্দের দিনেও মায়ের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয়নি। মা কী খাচ্ছেন, ওষুধ কীভাবে আসছে, কিংবা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কীভাবে জোগাড় হচ্ছে—এসব বিষয়ও অনেক সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে থাকে।
অসুস্থতার কারণে এই বৃদ্ধা মাকে ডায়াপার ব্যবহার করতে হয়। জানা গেছে, পূর্বে ঠান্ডাজনিত জটিলতার কারণে তিনি কয়েকবার নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীনও ছিলেন। সে সময়ও হাসপাতালে দেখা করতে যায়নি এমনও সন্তান ও নাতি-পুতিও আছেন। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য নাকি তখনই দেখা যায়, যখন এই বৃদ্ধা মা চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন—”ওরা আমাকে খোঁজ নেয় না, আমাকে দেখতে আসে না…”এমন কথার মধ্যে শুধু একজন মায়ের কষ্ট নয়, লুকিয়ে থাকে দীর্ঘ প্রতীক্ষার বেদনা।
পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্যমতে, কখনো কখনো কিছু সন্তানের উপস্থিতি আন্তরিকতার চেয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতা কিংবা আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার সীমাবদ্ধতায় আটকে আছে বলেও অনুভূত হয়। তবে একজন মা সন্তানের চেহারা দেখেই অনেক সময় বুঝে যান—ভালোবাসা হৃদয় থেকে এসেছে, নাকি শুধুই পরিস্থিতির প্রয়োজন থেকে।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, অর্থের পেছনে ছুটে চলা আর ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তাধারা পরিবারগুলোর মানবিক বন্ধনকে দুর্বল করে দিচ্ছে। অথচ যে মা নিজের ভেজা বিছানায় শুয়ে সন্তানকে শুকনো জায়গায় রেখেছেন, নিজের ক্ষুধা লুকিয়ে সন্তানকে খাইয়েছেন, তার বার্ধক্যে পাশে দাঁড়ানো শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়—এটি মানবতা, নৈতিকতা এবং ধর্মীয় কর্তব্যও।
ধন-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি কিংবা সামাজিক পরিচয় মানুষকে বড় করতে পারে, কিন্তু প্রকৃত মানুষ হওয়ার পরিচয় পাওয়া যায় পিতা-মাতার সেবায়। মনে রাখতে হবে—পৃথিবীতে এমন কোনো সম্পদ নেই, যা মায়ের বুকের এক ফোঁটা দুধের ঋণ পরিশোধ করতে পারে।
আজ যারা বৃদ্ধ মা-বাবাকে সময় দিতে পারছেন না, তাদের জন্য সময় একটি নীরব প্রশ্ন রেখে যায়—
একদিন আপনিও বৃদ্ধ হবেন। একদিন আপনিও অপেক্ষা করবেন সন্তানের একটি ফোন, একটি খোঁজ, কিংবা পাশে বসে থাকা একটি মানুষের জন্য।
শেষ কথা:মাকে ভালোবাসুন লোক দেখানোর জন্য নয়, হৃদয়ের গভীরতা থেকে। কারণ মায়ের জন্য ব্যয় করা সময় কখনো অপচয় হয় না; বরং সেটিই মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অর্জন।
— দুর্নীতি তালাশ নিউজ টিভি।
(তাং- ২৭-০৫-২০২৬ ইং)