কল্যান রায় জয়ন্ত
যশোরের মণিরামপুরে যৌতুকের দাবিতে স্বামী, ভাসুর ও শাশুড়ির বিরুদ্ধে এক গৃহবধূকে মারধর ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী গৃহবধূ বিথিকা সুলতানা মণিরামপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলার বাহিরঘোরিয়া গ্রামের মহাতাব উদ্দিনের মেয়ে বিথিকা সুলতানা (২৬) প্রায় তিন বছর আগে কাজিয়াড়া গ্রামের মৃত খালেক গাজীর ছেলে মেহেদি হাসানের (৩২) সঙ্গে ৩ বছর পূর্বে পারিবারিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দাম্পত্য জীবনে তাদের একটি ছেলে সন্তান (মাহির-৮ মাস) রয়েছে। বিয়ের পর থেকেই স্বামী মেহেদি হাসান, তার বড় ভাই সোহরাব হোসেন (৪৮) এবং শাশুড়ি লালবানু বিবি (৬০) যৌতুকের দাবিতে তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন। যৌতুকের টাকা দিতে না পারলে তাকে মারধর করে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। মেয়ের সংসার টিকিয়ে রাখতে তার বাবা মহাতাব উদ্দিন আসবাবপত্র, বিভিন্ন সামগ্রী এমনকি ছাগলও দেন। তবে কিছুদিন শান্ত থাকার পর আবারও তার ওপর নির্যাতন শুরু হয়।
গত ৯ মার্চ দুপুর আনুমানিক ১টার দিকে স্বামী মেহেদি হাসান পুনরায় টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে স্বামীসহ অন্যরা তাকে ঘরের ভেতরে আটকে রেখে এলোপাতাড়ি মারধর করেন। এতে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত ও নীলাফোলা জখম হয়। একপর্যায়ে স্বামী লোহার রড দিয়ে মাথায় আঘাত করে গুরুতর জখম করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া স্বামী ও শাশুড়ি তাকে গলা টিপে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা করেন এবং তাদের ৮ মাস বয়সী শিশু সন্তান মাহিরকে ছুড়ে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
ঘটনার পর স্থানীয়দের সহায়তায় তার বাবা তাকে উদ্ধার করে মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা করান। পরে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে পরামর্শ করে তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। এ ঘটনায় বাহিরঘোরিয়া গ্রামের রেজাউল হোসেন ও গোপালপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলামসহ স্থানীয় কয়েকজন বিষয়টি জানেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী গৃহবধূ বিথিকা সুলতানা জানান, আমার স্বামী পরকীয়া এবং মাদকাসক্ত। আমাকে বিভিন্ন সময়ে যৌতুকের জন্য নির্যাতন করতো। সংসার বাঁচাতে আমি কয়েকদফা বাবার বাড়ি থেকে টাকা-পয়সা ও জিনিসপত্র নিয়ে দিয়েছি। আমার সন্তানের জন্মের পর থেকে আমার স্বামী আমার দেখাশোনা এমনকি ভরণপোষণ দেন না। আমার ভাসুরের ইন্দনে আমাকে ডিভোর্স দেওয়ার পায়তারা করছে। আমি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে শ্বশুরবাড়িতে বাচ্চাসহ উঠলে কয়েকদিনের মাথায় আমার ভাসুরের নির্দেশে শাশুড়ি ও স্বামী মিলে আমাকে হত্যার উদ্দ্যেশে লোহার রড় দিয়ে মাথায় আঘাত করে এবং মেঝেতে ফেলে গলার উপর উঠে দাড়ায়। একপর্যায়ে আমি আমার বাবার বাড়িতে জানালে, আমার বাবা-মা ও ভাবি আমাকে নিয়ে মনিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে চিকিৎসা করান। পরবর্তীতে আইনি সহায়তার জন্য আমি থানায় লিখিত অভিযোগ করেছি। অভিযোগ করার পর আমার স্বামী ও ভাসুর বিভিন্ন মাধ্যমে আমাকে ও আমার পরিবারকে হুমকি-ধামকি দিচ্ছে। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমি আইনের কাছে ন্যায় বিচার চাই।
বিথিকা সুলতানার ভাবি জানান, খবর পেয়ে আমার ননদকে আনতে গেলে আমাদের সামনে তার শাশুড়ি মারধর করেন। স্থানীয়দের সহায়তায় চিকিৎসার জন্য আমরা দ্রুত মনিরামপুর হাসপাতালে নিয়ে আসি। সেই থেকে ও (বিথিকা সুলতানা) আমাদের বাড়িতে আছে।
বিথিকা সুলতানার পিতা মহাতাব উদ্দিন জানান, আমার মেয়েকে বিয়ের পর থেকে বিভিন্ন সময় যৌতুকের জন্য চাপ দিতো। আমি গরীব মানুষ। তারপরও মেয়ের সুখের জন্য ধার-দেনা করে বিভিন্ন সময়ে জামাইকে টাকা-পয়সা ও জিনিসপত্র দিয়েছি। আমার জামাই মাদকাসক্ত ও মাদক ব্যবসায়ী। কয়েকদিন আগে আমার মেয়েকে হত্যার উদ্দ্যেশে মারধর করেছে। মনিরামপুর হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসছি। আমি আমার জামাই ও তার পরিবারের শাস্তি চাই।
ঘটনার বিষয়ে অভিযুক্ত স্বামী মেহেদী হাসানের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, বিভিন্ন সময়ে পারিবারিক কলহে তাকে টুকটাক মারধর করি এটা সত্য কিন্তু তাকে হত্যার উদ্দ্যেশ্যে কখনো মারধর করিনি। সে কিছুদিন আগে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। স্থানীয়দের সহায়তায় ঘরের টিন কেটে তাকে উদ্ধার করেছি। কয়েকদিন আগে আত্মহত্যা করার জন্য দরজা দিতে গেলে আমি দরজায় লাথি মারি, ওইসময় দরজার আঘাতে তার কপাল কেটে যায়। কয়েকটি চড় মারা ছাড়া তাকে আর মারধর করিনি।
ছেলের বৌ-কে মারধরের বিষয়ে ভুক্তভোগীর শাশুড়ি লালবানু বিবি’র কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমার বৌমা আমাকে গালিগালাজ ও মারধর করে। কয়েকদিন আগেও গালিগালাজ করছিল ওই সময় একটা চড় মেরেছিলাম। ছেলে-বৌ এর সাথে ঝগড়া হলে আমি তার মধ্যে যায় না।
এবিষয়ে মেহেদী হাসানের বড় ভাই সোহরাব হোসেনের নিকট মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমি দীর্ঘদিন ধরে খুলনাতে বসবাস করি। বাড়িতে কি হয় তা আমি জানি না। আমার সম্মান ক্ষুণ্ন করা জন্য আমার বিরুদ্ধে উদ্দ্যেশ্যপ্রণোদিত হয়ে থানায় অভিযোগ করা হয়েছে। আমি এর তীব্র নিন্দা জানাই।
এ বিষয়ে মণিরামপুর থানার অফিসার ইনচার্জ রজিউল্লাহ খান’র নিকট মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি জানান, অভিযোগটি গ্রহণ করা হয়েছে। তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।